গর্ভধারণের পর সন্তান জন্ম না নিয়ে মৃত ভ্রূণ বছরের পর বছর মায়ের শরীরে থেকে যাওয়ার ঘটনা চিকিৎসাবিজ্ঞানে অত্যন্ত বিরল। এমন অবস্থাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘লিথোপেডিয়ন’, যা সাধারণভাবে ‘পাথর শিশু’ নামে পরিচিত। কোনো মৃত ভ্রূণ দীর্ঘদিন শরীরের ভেতরে থেকে গেলে সেটিকে ঘিরে ধীরে ধীরে ক্যালসিয়াম জমতে থাকে। একপর্যায়ে সেটি শক্ত হয়ে পাথরের মতো আকার ধারণ করতে পারে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে ভারতের নাগপুরের এক নারীর এমনই বিরল ঘটনার কথা উঠে এসেছে। ৬০ বছর বয়সী ওই নারী ২০১৪ সালে তলপেটে ব্যথা এবং শক্ত একটি পিণ্ড নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। প্রায় দুই মাস ধরে তিনি এই সমস্যায় ভুগছিলেন। চিকিৎসকেরা প্রথমে তার পেটের শক্ত পিণ্ডটিকে টিউমার বলে ধারণা করেছিলেন।
তবে পরে ওই নারীর চিকিৎসা-ইতিহাস পর্যালোচনা করে চিকিৎসকেরা জানতে পারেন, ১৯৭৮ সালে তিনি সর্বশেষ গর্ভবতী হয়েছিলেন। সে সময় চিকিৎসকেরা তাকে জানিয়েছিলেন, তার গর্ভের সন্তান মারা গেছে। এ অবস্থায় অস্ত্রোপচারের পরামর্শও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অস্ত্রোপচারের ভয় পেয়ে তিনি হাসপাতাল থেকে নিজের গ্রামে ফিরে যান। এরপর আর চিকিৎসা নেননি।
পরবর্তী বছরগুলোতে মাঝেমধ্যে তলপেটে ব্যথা অনুভব করলেও স্থানীয় চিকিৎসকের কাছ থেকে ওষুধ নিয়ে তা সামলে নিতেন তিনি। এভাবেই কেটে যায় দীর্ঘ সময়। প্রায় ৩৬ বছর পর তলপেটে ব্যথা ও শক্ত পিণ্ড নিয়ে হাসপাতালে গেলে তার বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন চিকিৎসকেরা।
পেটের চিত্রায়ন পরীক্ষায় দেখা যায়, জরায়ুর পেছনে প্রায় ১১ × ৮ × ৮ সেন্টিমিটার আকারের একটি শক্ত পিণ্ড রয়েছে। এর ভেতরে হাড়ের মতো কাঠামোও দেখা যায়। চিকিৎসকদের ধারণা হয়, এটি মৃত ভ্রূণের অবশিষ্টাংশ হতে পারে। পিণ্ডটির চাপে দুই পাশের মূত্রনালিতেও সমস্যা তৈরি হয়েছিল এবং কিডনিতে প্রস্রাব জমে যাওয়ার লক্ষণ দেখা যায়।
এরপর অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে পিণ্ডটি অপসারণ করা হয়। অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসকেরা দেখতে পান, একটি শক্ত আবরণের ভেতরে ভ্রূণের হাড় রয়েছে। পরে পরীক্ষাগারে বিস্তারিত বিশ্লেষণের পর নিশ্চিত হওয়া যায়, এটি লিথোপেডিয়ন। অর্থাৎ দীর্ঘদিন ধরে মায়ের শরীরে থাকা মৃত ভ্রূণটি সময়ের সঙ্গে ক্যালসিয়াম জমে শক্ত হয়ে পাথরের মতো রূপ নিয়েছিল।
লিথোপেডিয়ন সাধারণত জরায়ুর বাইরে গর্ভধারণের ক্ষেত্রে দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে ভ্রূণটি পেটের ভেতরে স্থাপিত হয়ে মারা গেলে এবং মায়ের শরীর সেটিকে শোষণ করতে না পারলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
মৃত ভ্রূণটি শরীরের জন্য বড় হলে এবং তা থেকে সংক্রমণের আশঙ্কা তৈরি হলে শরীর সেটিকে অনেকটা বিদেশি বস্তুর মতো আবরণ দিয়ে ঘিরে ফেলে। সময়ের সঙ্গে ওই আবরণে ক্যালসিয়াম জমতে থাকে। ফলে ভ্রূণ ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে পাথরের মতো আকার ধারণ করে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত বিরল। একটি প্রতিবেদনে বিশ্বজুড়ে লিথোপেডিয়নের প্রায় ৩৩০টি ঘটনা নথিভুক্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কখনো পুরো ভ্রূণ ক্যালসিয়ামের স্তরে আবৃত হয়ে শক্ত হয়ে যায়, আবার কখনো নরম অংশ নষ্ট হয়ে শুধু হাড় বা কঙ্কাল অবশিষ্ট থাকে।
লিথোপেডিয়নের অন্যতম বিস্ময়কর দিক হলো, এটি মায়ের শরীরে কয়েক দশক পর্যন্ত অবস্থান করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ধরে এর কারণে বড় ধরনের কোনো উপসর্গও দেখা যায় না। পরে পেটে ব্যথা, শক্ত পিণ্ড বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার কারণে পরীক্ষা করতে গিয়ে বিষয়টি ধরা পড়ে।
মরক্কোর জাহরা আবুতালিবের ঘটনাটিও চিকিৎসাবিজ্ঞানে বেশ আলোচিত। ১৯৫৫ সালে সন্তান প্রসবের সময় জটিলতার মধ্যে পড়ে তিনি হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে যান। পরে তার প্রসববেদনা বন্ধ হয়ে গেলেও সন্তান জন্ম নেয়নি। প্রায় ৪৬ বছর পর ৭৫ বছর বয়সে তীব্র পেটব্যথা নিয়ে চিকিৎসকের কাছে গেলে পরীক্ষার মাধ্যমে তার শরীরে দীর্ঘদিন ধরে থাকা মৃত ভ্রূণের সন্ধান পাওয়া যায়। পরে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সেটি অপসারণ করা হয়।
চিকিৎসকেরা বলছেন, পেটের ভেতরে শক্ত কোনো পিণ্ড পাওয়া গেলে সেটিকে সবসময় টিউমার হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। রোগীর পূর্বের গর্ভধারণের ইতিহাস, শারীরিক পরীক্ষা ও চিত্রায়ন পরীক্ষার মাধ্যমে এর প্রকৃত কারণ শনাক্ত করা সম্ভব।
দীর্ঘদিন শরীরে থাকা লিথোপেডিয়ন অনেক সময় উপসর্গহীন থাকতে পারে। তবে এটি আশপাশের অঙ্গের ওপর চাপ সৃষ্টি করলে ব্যথা, মূত্রনালিতে বাধা কিংবা কিডনিতে প্রস্রাব জমে যাওয়ার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘পাথর শিশু’ নামে পরিচিত এই বিরল ঘটনা মানবদেহের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধব্যবস্থার একটি বিস্ময়কর উদাহরণ। একই সঙ্গে জরায়ুর বাইরে গর্ভধারণ ও মৃত ভ্রূণ দীর্ঘদিন শরীরে থেকে যাওয়ার সম্ভাব্য জটিলতা সম্পর্কেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেয়।