আমার হৃদয়ে ৩২ বছর
-সুমন বিপ্লব
বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও প্রকাশক সময় প্রকাশনের কর্ণধার ফরিদ আহমেদ আমার হৃদয়ে আজ ৩২ বছর ধরে আছেন। যতদিন বেঁচে থাকবো হয়তো আর কোনদিন আমার হৃদয় থেকে তিনি মুছে যাবেন না। কারণ তিনি যা আমার জন্য করছেন ১৯৮১ সালে থেকে লেখালেখি করি আজও আমার জন্য এতটুকু করিনি।
১৯৮৭ সালে আমি ঢাকায় গিয়েছিলাম লেখক হওয়ার জন্য। অনেক খোঁজাখুঁজি পর দৈনিক ইত্তেফাকের পাশে একটি সংবাদপত্রে বিক্রয় কেন্দ্র কাজ পেয়েছিলাম। প্রতিদিন আমি ম্যাগাজিন ও পত্রিকা পড়তাম। হঠাৎ একদিন উন্মাদে লুৎফর রহমান রিটন ভাইয়ের ঠিকানা পেয়ে যাই। ওয়ারী তখন বাসা। লেখা নিয়ে রাত দশটার সময় যেতাম। লেখাগুলি আন্তরিকতার সাথে দেখতে এবং খবরে প্রকাশ করে দিতেন। এমনিভাবে পরিচয় হয়ে যায় সাহিত্যিক সাজেদুল করিম, কবি আবু হাসান শাহরিয়ার, ছড়াকার সুজন বড়ুয়া, সরকার সুকুমার বড়ুয়া, কবি আল মুজাহিদী, সাহিত্যিক ইউসুফ শরীফ, সাহিত্যিক যাযাবর মিন্টু, কবি মারুফ রায়হান, কবি ফাহিম ফিরোজ, সাহিত্যিক শরিফ খান এবং আরো অনেক কবিদের সাথে পরিচয় হয় আমার।
১৯৯৪ সাল। আমি তখন ঢাকার গোপীবাগে কবি অসীম রায়ের সাথে মেচে থাকি। গুলিস্তানে বাসে ঘুরে ঘুরে পেপার বিক্রি করি। একদিন আমাকে যাযাবর মিন্টু বললেন,
: বাংলাবাজারে আমার একটি প্রকাশনীর সাথে পরিচয় আছে তুমি সেখান থেকে বই নিয়ে গুলিস্তান ফকিরাপুল কমলাপুরে বিভিন্ন লাইব্রেরীতে বিক্রি করতে পারো। তোমাকে ভালো কমিশন দিবে।
আমি একদিন যাযাবর মিন্টুর সাথে বাংলাবাজারে যাই, কিছু বই নিয়ে এসে গুলিস্তান ,পুরানো পল্টন, ফকিরাপুল, কমলাপুরে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন ছোট ছোট বইয়ের দোকানে পাইকারি বিক্রি করি। কয়েক ঘণ্টার ভিতর আমার ২০০ টাকা লাভ হয়ে যায়। এভাবে প্রতিদিন বই আনি আর বিক্রি করি। বইয়ের দোকানদাররা আমার কাছে হুমায়ূন আহমেদের বই চাইলেন। আমি যে প্রকাশনী থেকে বই আনি তারা হুমায়ূন আহমেদের বই প্রকাশ করেন না। হুমায়ুন আহমেদের বই খুঁজতে খুঁজতে হাজির হই বাংলাবাজারের সময় প্রকাশন প্রকাশনীতে হুমায়ূন আহমেদের বই নিলাম ৫% লাভে কমিশন দিয়েছিলেন। প্রতিদিন সময় প্রকাশন থেকে বই নিয়ে বিভিন্ন দোকান গুলোতে দেই। তখন পরিচয় হয়েছিল ফরিদ আহমেদ ভাইজানের সাথে। পেয়েছিলাম তাঁর আন্তরিকতা। তখন কবি খান মোহাম্মদ মইনুদ্দিন এর নাতি মামুন রাজ আমার একটি ছড়া ও গল্পের বই প্রকাশ করেছিলেন। জাতীয় পত্রিকায় তখন লেখা প্রকাশ পাওয়া শুরু করেছে। প্রতি সপ্তাহে দুই তিনটে লেখা প্রকাশ পায়। এবছরের শেষের দিকে আমি চলে আসি সিলেটে। ঘোরাঘুরি করতে থাকি শাহজালাল (র.)এর মাজারে। মুক্তার আলী নামক একজন যুবক আমাকে নিয়ে আসেন সিলেটের বিশ্বনাথের আকিলপুর গ্রামে কাজ করানোর জন্য। কাজ করতে করতে আবারো শুরু করি লেখালেখি ও ছাত্র পড়ানো। ছাত্র পড়াতে পড়াতে জানতে পারি এই আকিলপুর গ্রাম ডক্টর মঞ্জুশ্রী চৌধুরী ,ডক্টর অরূপ রতন চৌধুরী ডাক্তার শুভাগত চৌধুরীদের গ্রাম। ডক্টর মঞ্জুশ্রী ছিলেন আমার সাহিত্য গুরু ও প্রিয় লেখক। প্রিয় লেখক এর নামে প্রতিষ্ঠা করি ডঃ মঞ্জুশ্রী একাডেমি। দীর্ঘ ৩০ বছর পর ফিরে আসি আমার জন্মভূমি খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার শাহপুর গ্রামে ২০২৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে।
২০২৪ সালের শেষের দিকে ফেসবুকে দেখতে পেলাম সময় প্রকাশন থেকে দশটি সংকলন প্রকাশ পেতে যাচ্ছে। সময় প্রকাশন লেখাটা দেখতে পেয়ে মনে পড়ে যায় ফরিদ আহমেদ ভাইজানের কথা, তাঁর আন্তরিকতার কথা। ৯৪ সালে তিনি জানতেন না আমি যে লেখালেখি করি। আমার কথা তাঁর মনেও হয়তো নেই। কারণ আমি ছিলাম অতি সাধারণ একজন ব্যক্তি মাত্র।আমি দশটি সংকলনের জন্য দশটি লেখা ইমেইল যোগে পাঠিয়ে দিলাম। ২০২৫ সালের বইমেলায় সংকলন গুলো প্রকাশ পেল। আমার লেখা স্থান পেয়েছে ভ্রমণ সংকলন, ছড়া সংকলন ,অনু কাব্য সংকলন ,অনু গল্প সংকলন, অনুবাদ সংকলন ও কল্পবিজ্ঞান সংকলনে। ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে লেখকদেরকে কপি দিয়েছিলেন। আমি যেতে পারিনি কারণ ঢাকায় যাওয়ার মতন ভাড়া আমার কাছে ছিল না। পরে বইগুলো কুরিয়ারে পাঠিয়ে দিয়েছেন।
আবারো দেখতে পেলাম পাঁচটি সংকলন প্রকাশ পেতে যাচ্ছে। আমি দেরি না করে পাঁচটি লেখায় পাঠিয়ে দিলাম। ২০২৬ সালের বইমেলায় প্রকাশ পেয়েছে । পিতা মাতা কে নিয়ে আমার লেখা স্থান পেয়েছে। এবারও আনুষ্ঠানিকভাবে লেখকদের কপি দিয়েছেন। আমি কপি দেওয়ার ভিডিওটি দেখেছি। ফরিদাবাদ ভাইজান আমার নাম দুইবার ডেকেছেন আমি শুনেছি। এবারও ঢাকায় যাওয়ার মত অর্থ আমার ছিল না। পরের কুরিয়ারে বইটা আমাকে পাঠিয়ে দিয়েছেন। এমন একজন মহৎ মানুষের সান্নিধ্য পাওয়া আমার জন্য একটি শ্রেষ্ঠ পাওয়া। আরো কয়েকটি পান্ডুলিপি পাঠিয়ে দিয়েছি। জানি না এগুলো কি হবে তবুও আশায় থাকবো আমরণ।