বিয়ের শেরওয়ানি পরা হলো না প্রবাসী শরিফুলের
কুরবানির ঈদে বাড়ি ফেরার কথা ছিল, ফিরছেন নিথর দেহ হয়ে
আন্তর্জাতিক বার্তা প্রেরক: জীবন দেওয়ান উজ্জ্বল
‘ফুফু, কুরবানির ঈদে বাড়ি আসব। মেয়ে দেখে রেখো, দেশে এসে বিয়ে করব।’
স্বপ্নভরা এই কথাগুলোই ছিল মালয়েশিয়াপ্রবাসী শরিফুল ইসলাম ফকিরের শেষ কথোপকথনের অংশ। বয়স আনুমানিক ৩২ থেকে ৩৫ বছর। পরিবারের স্বচ্ছলতার স্বপ্ন নিয়ে প্রায় তিন-চার বছর আগে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া থেকে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি।
প্রবাসে কঠোর পরিশ্রম করে প্রতি মাসে নিজের খরচ বাদ দিয়ে পরিবারের কাছে পাঠাতেন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। তাঁর পাঠানো অর্থেই চলত পরিবারের সংসার। পাশাপাশি নিজের জীবন নিয়েও বুনেছিলেন কিছু ছোট ছোট স্বপ্ন—দেশে ফিরবেন, বিয়ে করবেন, নতুন সংসার শুরু করবেন এবং পরিবারের মুখে হাসি ফোটাবেন।
সেই স্বপ্নের কথাই গত রোববার স্বজনদের সঙ্গে ফোনালাপে জানিয়েছিলেন শরিফুল।
ফুফুকে বলেছিলেন, ‘কুরবানির ঈদে বাড়ি আসব। তোমরা মেয়ে দেখে রেখো।’
ফুফুও আশ্বাস দিয়েছিলেন, ‘তুই দেশে আয়, তারপর তোকে নিয়ে মেয়ে দেখতে যাব।’
কিন্তু পরদিনই ঘটে যায় মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।
মালয়েশিয়ায় ড্রেন নির্মাণের কাজে মাটি কাটার সময় হঠাৎ মাটি ধসে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে মাটির নিচে চাপা পড়ে যান শরিফুল। সহকর্মীরা তাঁকে উদ্ধারের চেষ্টা করে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়।
কুরবানির ঈদে পরিবারের সঙ্গে ঈদ করার যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা আর পূরণ হলো না। জীবিত শরিফুল আর বাড়ি ফিরবেন না—ফিরবেন নিথর দেহ হয়ে।
শরিফুলের পরিবারের ওপর নেমে এসেছে আরও বড় শোক। পরিবারের এক সন্তান ছোটবেলাতেই মারা গেছেন। বড় ছেলে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। ফলে পরিবারের অন্যতম প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছিলেন শরিফুল। তাঁর উপার্জন ও পাঠানো অর্থের ওপর নির্ভর করেই চলত সংসার।
মা নাসি বেগমেরও ছিল ছেলেকে ঘিরে অনেক স্বপ্ন। ছেলে দেশে ফিরলে বিয়ে দেবেন—এই আশায় ছিলেন তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন থমকে গেছে।
ঘর আছে, মা-বাবা আছেন, স্বজনেরা আছেন—শুধু নেই শরিফুল।
বাবা নজরুল ফকিরের আকুতি, ‘আমার ছেলেকে দ্রুত দেশে এনে দেন। শেষবারের মতো ছেলেটাকে দেখতে চাই।’
ছোট ভাই শিপুলও ভাইয়ের মুখ শেষবারের মতো দেখার অপেক্ষায়।
প্রবাসে যাওয়া মানুষগুলো শুধু অর্থ উপার্জনের জন্য বিদেশে পাড়ি জমান না। তাঁদের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের স্বপ্ন, মায়ের অপেক্ষা, বাবার ভরসা, ভাই-বোনের ভবিষ্যৎ এবং নিজের কিছু অপূর্ণ ইচ্ছা।
শরিফুলেরও স্বপ্ন ছিল—দেশে ফিরবেন, বিয়ে করবেন, নতুন জীবন শুরু করবেন।
কিন্তু নির্মম এক কর্মস্থল দুর্ঘটনা মুহূর্তেই কেড়ে নিল তাঁর সব স্বপ্ন।
বিয়ের শেরওয়ানি আর পরা হলো না শরিফুলের।
পরিবার এখন আর তাঁর জন্য পাত্রী খুঁজবে না। অপেক্ষা করবে শুধু প্রিয় মানুষটির মরদেহ দেশে ফেরার।
শরিফুলের অকালমৃত্যুতে শোকাহত পরিবার ও স্বজনরা তাঁর মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে শেষবারের মতো প্রিয়জনের মুখ দেখার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা কামনা করেছেন।
আল্লাহ মরহুম শরিফুল ইসলাম ফকিরকে ক্ষমা করুন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারকে এই অপূরণীয় ক্ষতি সহ্য করার শক্তি দিন।