আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায় ঘোষণা করেছে। এসব মামলায় মোট ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন মামলার আরও অনেক আসামিকে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী বিভিন্ন মেয়াদের সাজা দেওয়া হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের একাধিক রায়ে গণঅভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন, লাশ পোড়ানো এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় সাবেক রাজনৈতিক নেতা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। বিচার কার্যক্রম এখনও চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের বিচার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার নিয়েই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দুটি ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ছয়টি রায়ের মাধ্যমে সেই প্রতিশ্রুতির একটি বড় অংশ বাস্তবায়িত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, অল্প সময়ের মধ্যে সংবেদনশীল এসব মামলার বিচার সম্পন্ন হওয়া দেশের বিচারব্যবস্থায় একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। বর্তমানে আরও অনেক মামলা বিচারাধীন রয়েছে এবং সেগুলোও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে।
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর প্রথম রায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। একই মামলায় পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুন, যিনি রাজসাক্ষী হন, তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
রায়ে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের সম্পদ বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি নিহতদের পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় আন্দোলনের সময় ছয়জন নিহত হওয়ার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।
এ মামলায় সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী এবং রমনা বিভাগের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলামও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হন। এছাড়া আরও পাঁচ পুলিশ সদস্যকে চার থেকে ছয় বছর এবং তিন বছরের বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
আশুলিয়ায় ছয়জনের মরদেহ পুড়িয়ে ফেলা এবং আরও একজনকে হত্যার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ সাইফুল ইসলামসহ ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।
একই মামলায় সাতজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এছাড়া আরও দুই আসামিকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং একজন রাজসাক্ষীকে ক্ষমা করা হয়।
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের হত্যার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়।
এ মামলায় আরও ২৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা, শিক্ষক এবং তৎকালীন ছাত্রলীগের একাধিক নেতাও রয়েছেন।
রাজধানীর রামপুরায় নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা এক তরুণকে গুলি করে হত্যা এবং একই এলাকায় আরও দুইজন নিহত হওয়ার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।
একই মামলায় একজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অপর একজনকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
গণঅভ্যুত্থান দমনে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।
এছাড়া রায়ে দুটি অভিযোগে এক লাখ টাকা করে মোট দুই লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, গণঅভ্যুত্থান দমন এবং কুষ্টিয়ায় ছয়জন হত্যার ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
চানখাঁরপুলে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ ২০২৫ সালের ২৬ মে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হয়। এর মাধ্যমে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।
বর্তমানে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সংঘটিত গুম, হত্যা এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট মানবতাবিরোধী অপরাধের আরও একাধিক মামলার বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দুটি বেঞ্চে চলমান রয়েছে।