আমার সাহিত্যের গুরু ডক্টর মঞ্জুশ্রী চৌধুরী ও
শেখ আব্দুল জলিল
-সুমন বিপ্লব
ছেলেবেলায় প্রায় প্রত্যেকেই কোন না কোন স্বপ্ন দেখে। তেমন আমিও স্বপ্ন দেখেছিলাম ডাক্তার , ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী শিল্পী এর মধ্যে একটা কিছু হব। তাই কখনো ছবি আঁকতাম, নানা যন্ত্র তিনি নাড়াচাড়া করতাম। একসময় সেসব স্বপ্ন হারিয়ে গেল। ১৯৮১ সালে আমি সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। আমাদের বাংলা পাঠ্য বইয়ে প্রথম লেখাটি ছিল
” রূপসী বাংলাদেশ” লেখক ড. মঞ্জুশ্রী চৌধুরী। আমি যখন শাহপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় লেখাপড়া করতাম। বাংলা শিক্ষক ছিলেন কার্তিক মল্লিক। তিনি “রূপসী বাংলাদেশ” লেখাটি খুব সুন্দর করে আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। লেখাটি খুব ভালো লেগেছিল। এবছর আব্বা প্রতিদিন দৈনিক ইত্তেফাক রাখতেন তখন ইত্তেফাকের দাম মাত্র ছিল ১ টাকা। মধুগ্রামের মনি মোহন সাহা প্রত্যেকদিন খুলনা থেকে এনে দিতেন। আমি প্রতিদিন পত্রিকার সব লেখা পড়ে ফেলতাম। ডঃ মঞ্জুশ্রী চৌধুরীর লেখা বেশি দেখতাম। মনে মনে ভাবতাম তিনি বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ লেখক হয়তো। একদিন আমিও একটি লেখা লিখে ফেলি। এরপর একটি একটি করে কবিতার খাতা ভরে ফেলি। মনে মনে এক সময় ড. মঞ্জুশ্রী কে আমার লেখালেখির গুরু হিসেবে স্থান দিয়ে ফেলি। ইত্তেফাকের ঠিকানায় কচি কাঁচার আসর লেখা পাঠাতে শুরু করলাম। আমি লেখালেখি করি কিছুটা জানাজানি হয়ে গেছে। আমি তখন দশম শ্রেণিতে পড়ি। ১৯৮৫ সাল অলিউর রহমান নামে একজন ছাত্র এসে ভর্তি হয়েছিল। এক সময় অনলি ও জেনে যায় এবং তার সাথে আমার খুব বন্ধুত্ব হয়ে যায় সেও একটু একটু লেখে। একদিন বলল,
: আমার খালাতো ভাই একজন কবি।
: কি নাম?
: শেখ আব্দুল জলিল।
: সরকারি শাহপুর মধুগ্রাম কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল।
: হ্যাঁ।
: উনাকে অনেক দেখেছি কিন্তু তিনি একজন কবি তা জানতাম না।
দুই এক দিন পর আমার কবিতার খাতাটি অলিউর রহমানকে দিয়ে বললাম,
: তুমি এই খাতাটি তোমার ভাইকে দেখতে বলবে।
: ঠিক আছে।
সে আমার খাতাটি নিয়ে চলে যায়। ৭-৮ দিন পর খাতাটি আমার কাছে ফেরত দিল। আমি দেখতে পেলাম লাল কালি দিয়ে তিনি প্রতিটা লেখা সংশোধন করেছেন পরিশেষে তিনি একটি মন্তব্য লিখেছেন লালকালি
দিয়ে। সব লেখা মনে নেই যেটুকু লেখা মনে আছে আমি তুলে ধরলাম ,”তুমি যদি ধৈর্যের সাথে নিয়মিত লেখালেখি করে চলতে পারো। তাহলে অবশ্যই তুমি রবীন্দ্রনাথ, নজরুল অথবা শরৎচন্দ্রের মতো লেখক হতে পারবে।”আমি কথাগুলো আমার হৃদয়ে বসিয়ে রাখলাম। কয়েকদিন পর অলির সাথে কিছু লেখা নিয়ে জলিল স্যারের সাথে দেখা করি। স্যারের বাসা শাহপুর বাজারের গরু হাটের উত্তর পাশে। প্রথম দিনের দেখাতে প্রথম দিনের কথায় স্যারের সাথে আমার গভীর সম্পর্ক হয়ে যায়। স্যারের দুই স্ত্রী। বড় স্ত্রীর ছেলে মশিউল আলম
মুকুল এখানে থেকে শাহপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করত। স্যারের ছোট স্ত্রী রাজিয়া সুলতানা। তিনিও আমাকে ছোট ভাইয়ের মত আপন করে নেন। তিনিও লেখালেখি করেন। স্যারের শালা মেহেদী হাসান বিল্লাল ও লেখালেখি করতেন। এমনকি ছেলে মুকুলও লেখালেখি করতো। এরপর প্রায় আমি লেখা নিয়ে আসতাম। স্যারের বাসায় ছিল সেলফ ভরা বই। মাঝে মাঝে আমি নিয়ে পড়তাম। লেখা নিয়ে যেদিন এসেছি ভাবি কোন না কোন মজাদার খাবার বানিয়ে নে খাওয়াতেন। জাগরণ নামে পাঠাগার স্থাপন করি স্যার সেখানে বই এবং বিভিন্ন ভাবে সহযোগিতা করেছিলেন। ৮৫ সালে ভারত চলে যাই সেখানে দুই মাস থাকার পর ফিরে এসে আবার খুলনা খালিশপুরে মামার বাসায় ছিলাম। ৮৭ সালে ঢাকায় চলে যাই। ঢাকায় গিয়ে জাতীয় পত্রিকায় লেখালেখি শুরু করি। জলিল স্যারের কথা সব সময় মনে পড়তো। একটি সংবাদপত্র হকারের দোকানে চাকরি নিয়েছিলাম। তাই প্রতিদিন পত্রিকা পারতাম। বিভিন্ন পত্রিকায় ড. মঞ্জুশ্রী চৌধুরী লেখা দেখতে পেতাম। ৮৮ সালের বন্যার সময় আমি বাড়িতে ফিরে আসি। বাড়িতে এসে স্যারের সাথে দেখা করলাম। নতুন করে পরিচয় হলো সাহাপুর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের বাংলা শিক্ষক ও কবি ঊষা বিশ্বাসের সাথে। ও সাধের সহযোগিতা পেয়ে “ছাড়পত্র” নামে প্রথম ম্যাগাজিন প্রকাশের উদ্যোগ নিলাম। স্যার লেখা ও অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করলেন। ৯৪ সালে চিঠিতে জানতে পারলাম আমার বোন মিলি স্যারের শালা মেহেদী হাসান বেলালের কে বিয়ে করেছে। এ বছরের শেষের দিকে আমি সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার আকিলপুর গ্রামে চলে যাই। গ্রামটি ছিল আমার সাহিত্য গুরু ডক্টর মঞ্জুশ্রীর স্বামীর বাড়ি। ১৯৯৫ সালে গুরুর নামে ডঃ মঞ্জুশ্রী একাডেমি স্থাপন করি। ৯৬ সালে জলিল স্যারের সাথে চিঠি তে যোগাযোগ হয়। তিনি আমাকে নিয়ে ৯৭ সালে ১১১ লাইন কবিতা লিখেছিলেন। এত লম্বা কবিতা কোন পত্রিকায় প্রকাশ করতে পারিনি। অনেক সংকলন প্রকাশ করেছি সিলেটে থাকতে। স্যারের লেখা অনেক ম্যাগাজিনে প্রকাশ করেছি। মাঝে মাঝে স্যারের সাথে মোবাইলে আলাপ হত। তিনি আমাকে বাড়িতে আসতে বলতেন। ২০০৯ সাল। আমি ফোন করতেই তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বললেন,
: আমি তো ডুমুরিয়ার ইতিহাস নিয়ে একটা বই প্রকাশ করেছি সেখানে তোমাকে তুলে ধরতে পারলাম না। তোমার সাথে যোগাযোগ না থাকার জন্য। তুমি তোমার জীবনের বৃত্তান্ত পাঠিয়ে দাও আমি এখানে একটি ম্যাগাজিন প্রকাশ করি। ম্যাগাজিনের নাম সোনামুখ ।আমারই এক ছাত্র কামরুল ইসলাম নাম। ম্যাগাজিন টি পৃষ্ঠপোষকতা করে। আমি তথ্য পাঠিয়ে দিলাম প্রায় একমাস পর স্যার আমাকে নিয়ে বড় একটি প্রবন্ধ লিখে সেই ম্যাগাজিনে প্রকাশ করে ম্যাগাজিন সহ স্যারের একটা কবিতার বই আমার কাছে পাঠিয়ে দিলেন। স্যারকে আমার ম্যাগাজিনের উপদেষ্টা রাখতাম সব সময়। ২০২৩ সাল আমি বাড়িতে শান্ত হলাম স্যার এখন আর শাহপুর থাকেন না তার গ্রামের বাড়ি কুকিয়ায় থাকেন। স্যারের ছোট স্ত্রী রাজিয়া সুলতানা আমাকে নিয়ে কুকিয়া গ্রামে যান। তিনি এখন খুব একটা চোখেও দেখেন না, কানেও শোনেন না, তাই লেখালেখিও বিশ্বাস করেন না। তিনি শাহপুর গ্রামে মাদ্রাসা ও নিজের গ্রামে মসজিদ স্থাপন করেছেন। সকল বইগুলো তিনি নিজের এলাকায় একটি হাইস্কুলের পাঠাগারে দান করেছেন। আমি স্যার কে নিয়ে একটি স্মারক গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিলাম। খুব একটা লেখা না পাওয়ায় আজও বইটি প্রকাশ করতে পারেনি। তবে বইটি অবশ্যই একদিন প্রকাশ করব।
আরেকটি কথা না বললেই নয়। আমি যখন সিলেটে ছিলাম তখন সরকারি শাহপুর মধুগ্রাম কলেজের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল কবি ও বিশিষ্ট সাহিত্যিক ফারুক আলম স্যার মাঝে মাঝে ফোন করতেন এবং বলতেন,
: আপনি বাড়িতে আসেন একসাথে ম্যাগাজিন প্রকাশ করব।
তিনি আমার কাছে তাঁর সম্পাদিত একটি গল্প সংকলন পাঠিয়েছিলেন।
বাড়িতে এসে আমার ভাগ্নে অর্ণব হাসান কে নিয়ে ফারুক আলম স্যারের সাথে বাসায় দেখা করি। ম্যাগাজিন প্রকাশ করব করব করেই তিন বছর কেটে গেল। অবশেষে “আগমনী” নাম দিয়ে ফারুক আলম স্যারকে প্রধান উপদেষ্টা রেখে ম্যাগাজিন কে প্রকাশ করতে যাচ্ছি। সবার সাহায্য সহযোগিতা পেলে ম্যাগাজিন নিয়মিত প্রকাশ করতে পারবো।